বিএনপি অভিযোগ করে বলেছে, নির্বাচন বানচালের জন্য সরকার দেশব্যাপী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতার মৌতাতে বুঁদ হয়ে থাকার জন্যই অবৈধ শাসকগোষ্ঠী আসন্ন নির্বাচন নিয়ে মাস্টারপ্ল্যানে ব্যস্ত আছে। আর নির্বাচন কমিশন (ইসি) হয় অন্ধ না হয় কানা।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আজ রোববার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ কতিপয় কমিশনার সরকারের পক্ষে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন। নির্বাচন কমিশন, পুলিশ প্রশাসন, আইন-আদালত, বিচারিক প্রক্রিয়া সবকিছুর উপরই সরকার যেন সিন্দাবাদের জ¦ীনের মতো সওয়ার হয়ে আছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে গেলে মনোনয়ন পত্রের দু’পাশ থেকে ধরে আছেন পুলিশের দুজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। অর্থাৎ পুলিশ কর্মকর্তারা সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন তারা আওয়ামী লীগের পক্ষে। অথচ এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন উদাস কবির মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য কোনো ব্যবস্থা নিলো না।
নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনে দলের কেন্দ্রীয় নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ, তাইফুল ইসলাম টিপু, বেলাল আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে রুহুল কবির রিজভী বলেন, তফসিল ঘোষণার শুরু থেকেই নির্বাচনের পরিবেশ যেন আরো অবনতিশীল হয়েছে। নৌকার পক্ষে হালে পানি না পাওয়ায় বিএনপিসহ বিরোধী দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী ও নেতাকর্মীদের শুধু মিথ্যা মামলা দায়ের ও গ্রেফতার করেই সরকারের সাধ মিটছে না এখন তাদের ভিটে-মাটিতে ঘু ঘু চরিয়ে দিতে তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। সারাদেশে প্রার্থীসহ বেছে বেছে বিএনপির সক্রিয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, গুম করা হচ্ছে। প্রার্থীসহ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বাড়িতে বাড়িতে হামলা চালচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। আর এসব কিছু নেপথ্য থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে দুটি শক্তিশালী কেন্দ্র- একটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও অন্যটি গণভবন, নির্বাচন কমিশন হুকুম-বরদার মাত্র। কমিশন শুধু ওই দুই কেন্দ্রের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, দেশে বিরোধী দলশূন্য নির্বাচনী মাঠ তৈরি করতেই এসব ঘৃণ্য অপকর্ম সাধন করা হচ্ছে। যেভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিএনপিসহ বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদেরকে ছোঁ মেরে তুলে নিচ্ছে, গুম করছে, গ্রেফতারের পর অস্বীকার করছে, রিমান্ডে নিয়ে অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছে এবং জামিনে মুক্তিলাভের পরও জেলগেট থেকে শ্যোন অ্যারেস্ট করা হচ্ছে তাতে সারাদেশে এক রক্ত-শীতল করা আতঙ্কজনক পরিবেশ বিরাজমান হয়েছে। জনগণকে ভোট থেকে দূরে রাখার জন্য তারা পরিকল্পিতভাবে ভোটের পরিবেশ বিনষ্ট করার পাঁয়তারা করছে। পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সরকারী দলের অনাচারের সাথে তাল মিলিয়ে চলার ঘটনা থেকেই মনে হয়-তারা ভোটারদের ভীতিগ্রস্ত করতে চায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে নির্বাচনের সময় এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি কখনো দেখা যায়নি। সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবেই এসব করা হচ্ছে নৌকাকে জালিয়াতির মাধ্যমে বিজয়ী করার জন্য।
বিএনপির এই নেতা বলেন, তফসিল ঘোষণার পর গাজীপুরের ওসি আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে পোশাক পরে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং তিনি সেখানে বক্তৃতাও দিয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশন এক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বলে কারো জানা নেই। অথচ সময়ের অজুহাত তুলে বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের মনোনয়নপত্র জমা নেয়া হয়নি। মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অধ্যাপক গোলাম রাব্বানীর পক্ষে রাকিবুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি মনোনয়নপত্র জমা দিতে গেলে তাকে পুরনো একটি মামলায় গ্রেফতার করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। অথচ কিছু রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের পক্ষপাতযুক্ত বেআইনী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এই পক্ষপাতের ধারা ভোট গ্রহণের দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। সুতরাং কমিশন নিজেরাই নিজেদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
রিজভী বলেন, ওসি ও এসপি পর্যায়ের কর্মকর্তারা এখনই যেভাবে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিচ্ছে তাতে নির্বাচনের দিনে কি পরিস্থিতি হবে তা সহজেই অনুধাবন করা যায়। এতো নিয়মভঙ্গের পরও নির্বাচন কমিশনের চোখ বন্ধ রাখাটা আগামী জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে কমিশনের ভূমিকা সারাবিশ্বে একটি খারাপ দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লিখিত হবে। অথচ প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা গত দুইদিন আগে সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন- সারাদেশে কোথাও নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে না। তবে সিইসির আচরণবিধি লঙ্ঘনের এধরনের তথ্য মানুষ খুব একটা গ্রাহ্য করছে না এজন্য যে, তফসিল ঘোষণার আগে ও পরে আওয়ামী লীগ রাস্তাঘাট দখল করে রাস্তার ওপর গেট বানিয়ে, বড় বড় নৌকা টাঙ্গিয়ে রেখেছে। আওয়ামী হার্মাদরা মহাসড়ক দখল করে বিশাল বিশাল বিলবোর্ড টাঙ্গিয়েছে। কমিশনের নির্দেশে নির্বাচনী কিছু ব্যানার-পোস্টার তুলে ফেলা হলেও নৌকায় হাত দিতে কেউ সাহস পায়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়-গোটা নির্বাচন কমিশনই নৌকায় চেপে বসে মাঝ নদীতে ভাসছে কিন্তু কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছে না।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী মীর মো: নাসির উদ্দিন নির্বাচনে তার অংশগ্রহণের অনিশ্চয়তার বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানিছেন। তিনি চট্টগ্রাম-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রার্থী। মীর নাসির বলেন, মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর এধরনের বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ প্রকাশ বিএনপি নেতাকর্মী ও নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের মধ্যে বিরুপ প্রভাব ফেলবে। ২০০৭ সালে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত তার বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশ দেন। এরপর তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন, আপীল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জজ আদালতের দন্ডাদেশ স্থগিত করেন, যা এখনো বলবৎ আছে। ফলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে মীর নাসিরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের চিত্র তুলে ধরে রিজভী বলেন, গতকাল সন্ধ্যার পর বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি মীর সরফত আলী সপু এবং বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাইফুল ইসলাম পটুকে গ্রেফতার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যুবদল গাজীপুর মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মো: জসিম উদ্দিন বাটকে গত পরশু বিকেলে গোয়েন্দা পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে। কিন্তু তার আটকের বিষয়টি অস্বীকার করছে তারা। সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজ নেয়া হলেও তার এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি। আসন্ন নির্বাচনের পূর্বে মীর সরফত আলী সপু, সাইফুল ইসলাম পটুকে গ্রেফতার করা উদ্দেশ্যমূলক ও দূরভিসন্ধিমূলক। আমি অবিলম্বে তাদের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানাচ্ছি। এছাড়া জসিম উদ্দিন বাট নিখোঁজ থাকার ঘটনায় আমি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। তাকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীই আটক করে নিয়ে গেছে। নিখোঁজ থাকার ঘটনায় তার পরিবার এবং দলের নেতাকর্মীরা গভীর উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় আছে। আমি অবিলম্বে জসিম উদ্দিন বাটকে সুস্থাবস্থায় তার পরিবারের নিকট ফিরিয়ে দেয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, শনিবার বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর নাটোরের বাসভবনে নির্বাচনী মতবিনিময় সভা চলাকালে আওয়ামী সশস্ত্র সন্তাসীরা সভার ওপর হামলা ও ভাংচুর চালায়। আমি তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। এছাড়া ফেনী সদর উপজেলায় বেলায়েত হোসেন বাচ্চুকে গ্রেফতার করেছে। ফেনী-২ নির্বাচনী আসনে বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক জয়নাল আবেদীনের বাসায় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ বিষয়ে প্রশাসনকে অবহিত করলেও প্রশাসন নির্বিকার রয়েছে। ঢাকা মহানগরীর শ্যামপুরে আরিফ আহমেদ রাতুল, কদমতলী থানা বিএনপি নেতা হাফেজ সরকার, মোহাম্মদপুরে ছাত্রদলের মাজহারুল ইসলাম মারুফ, চট্টগ্রাম মহানগরে মোশারফ হোসেন জামাল, মুন্সিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের শ্যামল, শেরপুরে রফিকুল ইসলাম মিন্টুকে গ্রেফতার করে এবং গভীর রাতে বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে-বাড়িতে তল্লাশি চালায় ও পরিবারের সদস্যদের সাথে খারাপ আচরণসহ ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বাগেরহাটে যুবদলের এম এ ওয়াহিদকে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ব্যাপক মারধর করে গুরুতর জখম করে। পুলিশ মামলা নেয়নি। আমি বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদেরকে গ্রেফতারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং তাদের অসত্য ও হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহারসহ অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি করছি।